রাষ্ট্রচিন্তা কী? অথবা, রাষ্ট্রচিন্তার সংজ্ঞা দাও। অথবা, রাষ্ট্রচিন্তা বলতে কী বুঝায়? অথবা, রাষ্ট্রচিন্তা বুঝিয়ে লেখ?

 প্রশ্ন: রাষ্ট্রচিন্তা কী? অথবা, রাষ্ট্রচিন্তার সংজ্ঞা দাও। অথবা, রাষ্ট্রচিন্তা বলতে কী বুঝায়? অথবা, রাষ্ট্রচিন্তা বুঝিয়ে লেখ?


প্রাচীন যুগ : গ্রিক সমাজ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ



উত্তর :

ভূমিকা : রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান । কিন্তু কিভাবে এ প্রতিষ্ঠানটি উৎপত্তি লাভ করেছে , বিকশিত হয়েছে এবং সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনকে কিভাবে প্রভাবিত করে বর্তমান রূপ লাভ করেছে তা যুগে যুগে বহু মনীষীর ভাবনাচিন্তায় স্থান পেয়েছে । 


রাষ্ট্র এবং এর বিভিন্ন বিষয়াদি সম্পর্কে বিভিন্ন চিন্তাবিদদের সক্রিয় ভাবনাই রাষ্ট্রচিন্তা । আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চায় এ ভাবনাগুলাে বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলােচিত হয় ।


রাষ্ট্রচিন্তা : যুগের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী । আর যুগের পরিবর্তনের সাথে মানুষের চিন্তাধারায়ও ঘটে যায় আমূল পরিবর্তন । তাই দেখা যায় , বিভিন্ন যুগের মনীষীগণ বিভিন্ন পরিবেশের প্রভাবে রাষ্ট্র সম্পর্কে বিভিন্ন রকম চিন্তাভাবনা করেছেন । 


ফলে বিভিন্ন যুগের রাষ্ট্রচিন্তায় দেখা দিয়েছে বৈচিত্র্য । রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের এই যে চিন্তা যুগে যুগে তাদের স্ব - স্ব বৈচিত্র্য নিয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে এটাকেই বলা হয় রাষ্ট্রচিন্তা ।


প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রচিন্তার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন । নিম্নে তাদের কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলাে : 

অধ্যাপক আর্নেস্ট বার্কার ( Prof. Ernest Barker ) এর মতে , “ রাষ্ট্রীয় মতবাদ বিভিন্ন চিন্তাবিদদের চিন্তাচেতনা ও গবেষণার ফসলস্বরূপ , অনেকাংশেই এটা তাদের সমসাময়িক কালের বাস্তব ঘটনাবলি থেকে দূরে থাকে , কিন্তু রাষ্ট্রদর্শন একটি যুগের বাস্তব ঘটনাবলির স্থায়ী দর্শন । " ( Political theory is the speculation of particular thinkers , which may be remote from actual fact of the time . Political thought is the imminent philosophy of the whole age .)


অধ্যাপক ফিলিপ ডােয়েল ( Prof. Phillip Doyle ) এর মতে, “ রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়বস্তু প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য । যথা : মানবপ্রকৃতি ও তার কার্যকলাপ , জীবনের সমগ্র অনুভূতির জন্য পৃথিবীর অপরাপর বিষয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক ।


অধ্যাপক ওয়েপার (Prof. Weypar) বলেছেন, “ রাষ্ট্রচিন্তা বলতে বুঝায় সে মতবাদ , যা রাষ্ট্রের গঠন , প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলােচনা করে । ” তিনি আরাে বলেছেন , “ সামাজিক প্রাণী হিসেবে মানুষের আচরণের নৈতিক দিকগুলােও এর আলোচ্য বিষয় । কারণ নাগরিকদের নৈতিকতাবােধ ও সামাজিক মূল্যবােধ সরকারের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে ।


" অধ্যাপক হেরম্যান হেলার ( Prof. H. Heller ) বলেছেন , “ রাষ্ট্রচিন্তা রাষ্ট্রের স্থিতিশীল পর্যায়গুলাে আলােচনা করে । ” উল্লিখিত মতামতগুলাে পর্যালােচনা করে বলা যায় যে , সমাজবদ্ধ মানুষের প্রকৃতি , তার রাজনৈতিক আচরণ ও কার্যাবলি , আচরণের নৈতিক দিক , ব্যক্তির সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ক , ' রাষ্ট্রের গঠন , কার্যাবলি এবং মানবজীবনের সার্বিক দিকের উপর এগুলাের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি সম্পর্কে বিভিন্ন যুগের মনীষীদের চিন্তাভাবনাগুলােকে সমষ্টিগতভাবে রাষ্ট্রচিন্তা বলে আখ্যায়িত করা হয়।


 উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, রাষ্ট্র এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মৌলিক রাজনৈতিক ধারণা, ব্যক্তির রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, ব্যক্তিজীবনের উপর এসব রাজনৈতিক ধারণার প্রভাব ইত্যাদি সম্পর্কে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে ।


 এ ধারণাগুলাে কখনাে ছিল নৈতিকতা নির্ভর, কখনাে ধর্মীয় ভাবনা প্রসূত এবং কখনাে মানুষের । মুক্ত চিন্তাশক্তি নির্ভর । সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন যুগের, বিভিন্ন ধরনের এবং বিভিন্ন ব্যক্তির স্বকীয় ভাবনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের । জ্ঞানভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে । তাই রাষ্ট্রচিন্তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।



মন্তব্যসমূহ